জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: ভোপালের আদর্শনগর বস্তি। একটি ছোট্ট ঘরে চুপচাপ বসে রাজেশ বিশ্বকর্মা। চেষ্টা করছেন তাঁর জীবনের হারিয়ে যাওয়া অংশগুলো ফের জোড়া লাগানোর। অন্যায়ভাবে তার জীবন থেকে কেড়ে নেওয়া হয়েছে ৩৯৫ দিন। কেটেছে জেলে। কোনো অপরাধ করার জন্য নয়। বরং এক অসুস্থ মহিলাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার জন্য।
পেশায় দিনমজুর রাকেশ। বাবা-মা নেই। দেশের আইনি কানুন সম্পর্কে কোনও ধারণাও নেই। ২০২৪ সালের ১৬ই জুন। পাড়ার একজন অসুস্থ মহিলাকে ডিআইজি বাংলোর কাছে একটি হাসপাতালে নিয়ে যান। মহিলা যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছিলেন। একজন ভালো মানুষ হিসেবে যা করার দরকার ছিল সেটাই করেছিলেন রাজেশ। মহিলাকে ভর্তি করিয়ে কাজে চলে যান। সন্ধ্যায় মহিলাটি মারা যান। আর পরের দিন সকালে রাজেশকে খুনের অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়।
রাজেশ বলেন, “আমি শুধু তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলাম কারণ তিনি আমাকে অনুরোধ করেছিলেন। সন্ধেয় পুলিস আমাকে তুলে নিয়ে যায়। জিজ্ঞাসাবাদ করে, আর পরের দিন আমাকে গ্রেফতার করা হয়। আমি তাদের বলেছিলাম যে আমি তাঁকে চিকিৎসার জন্য নিয়ে গিয়েছিলাম। তারা আমাকে আমার পরিবারের সাথে কথা বলতে দেয়নি। আমাকে ৯ দিন থানায় রাখা হয়েছিল, তারপর সরাসরি জেলে পাঠানো হয়। আমার কাছে একজন আইনজীবী নিয়োগের মতো টাকা ছিল না।
রাজেশের ভাড়া ঘরটি পুলিস নোটিস চাড়াই তালাবদ্ধ করে দেয়, যার ফলে রাজেশ গৃহহীন হয়ে পড়েন। রাজেশ বলেন, “এখন, আমাকে ১৩ মাসের ভাড়া দিতে হবে। কেউ আমাকে কাজ দিচ্ছে না। সবাই বলছে আমি জেল থেকে এসেছি। আমি নির্দোষ ছিলাম, তবুও আমাকে জেলের পিছনে থাকতে হয়েছে। আমার কোনো জমি নেই, বাবা-মা নেই, কিছুই নেই… আমার বদনামও হয়েছে,”
এক বছরেরও বেশি সময় ধরে রাজেশ বিচার ছাড়াই জেলে কাটিয়েছেন, কোনো আইনি পরামর্শ বা পরিবারের সাথে যোগাযোগের সুযোগ পাননি। তাঁর বোন কমলেশ, যিনি ইতিমধ্যেই নিজের পরিবার চালাতে হিমশিম খাচ্ছিলেন, তাঁকে রাজেশের গ্রেফতারের নয় দিন পর জানানো হয়।
আরও পড়ুন-আধার নাগরিকত্বের প্রমাণ নয়, ভারতের নাগরিক হতে গেলে থাকতে হবে এই ৪ নথি
আরও পড়ুন-‘পাইকারি হারে নাম বাদ গেলে আদালত….’, SIR শুনানিতে কড়া সুপ্রিম কোর্ট
কমলেশ বলেন, বিকেল ৪টায় আমাকে ফোন করে আদালতে আসতে বলে। আমি একা ছিলাম এবং যেতে পারিনি। এক সপ্তাহ পর যখন তার সাথে দেখা করি, সে আমাকে সব বলে। যখন আমি তার আধার কার্ড ও ফোন নিতে থানায় যাই, তারা আমাকে অনেক ঘোরানোর পর সেগুলো ফেরত দেওয়ার জন্য ৫০০ টাকা দাবি করে। এটা আমাদের জন্য আরও একটি খরচ ছিল। সে এখন কিছু করার চেষ্টা করছে, কিন্তু পুলিশ যদি সঠিকভাবে তদন্ত করত, তাহলে এটা কখনোই ঘটত না। আমাদের পরিবারের কেউ শিক্ষিত নয়। যখন পারতাম, তার সাথে দেখা করতে যেতাম,” তিনি বলেন।
আদালত অবশেষে রাজেশকে নির্দোষ ঘোষণা করে। কিন্তু ন্যায়বিচারের পথ তৈরি করেছিল পুলিস নয়, বরং আদালত নিযুক্ত আইনি সহায়তাকারী আইনজীবী রীনা ভার্মা।
রীনা বলেন, “তার কাছে একজন আইনজীবী নিয়োগের মতো টাকা ছিল না। আদালত আমাকে নিয়োগ করেছে, এবং আমরা সম্পূর্ণ সততার সাথে কাজ করি যাতে ন্যায়বিচার নিশ্চিত হয়।
শ্রীমতি রীনা ভার্মা আরও বলেন, “এমন নথি ছিল যা দেখাচ্ছিল যে মহিলাটি অসুস্থতার কারণে মারা গেছেন, কিন্তু পোস্টমর্টেম রিপোর্টে শ্বাসরোধে মৃত্যুর কথা বলা হয়েছিল। পুলিস হাসপাতালের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করেনি। মেডিকেল রিপোর্টে মৃতদেহের পোশাকের মধ্যে অসামঞ্জস্য দেখা গিয়েছিল। এমনকি মহিলাটি কে ছিলেন, সেটাও স্পষ্ট ছিল না। যে ব্যক্তি তাঁকে হাসপাতালে নামিয়ে দিয়েছিলেন, তাঁকে খুনের অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়েছিল কোন ভিত্তিতে? কোনো প্রমাণ ছিল না। তদন্ত ছিল অসতর্ক এবং দুর্বল,”
(দেশ, দুনিয়া, রাজ্য, কলকাতা, বিনোদন, খেলা, লাইফস্টাইল স্বাস্থ্য, প্রযুক্তির টাটকা খবর, আপডেট এবং ভিডিয়ো পেতে ডাউনলোড-লাইক-ফলো-সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের App, Facebook, Whatsapp Channel, X (Twitter), Youtube, Instagram পেজ-চ্যানেল)

